উৎপত্তি উদ্ভাবক: ১৯৫০ সালে গণিতবিদ মেরিল ফ্লাড এবং মেলভিন ড্রেশার এটি তৈরি করেন। নামকরণ: পরবর্তীতে আলবার্ট ডব্লিউ টাকার কয়েদিদের শাস্তির উদাহরণ দিয়ে এটিকে সাজান এবং “প্রিজনারস ডিলেমা” নামকরণ করেন।
মূল উদ্দেশ্য: কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় পারমাণবিক প্রতিযোগিতার কৌশল বিশ্লেষণের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। মূল রূপরেখা ও ফলাফল ধরা যাক, দুজন অপরাধী (A এবং B) একটি অপরাধে ধরা পড়েছে। পুলিশ তাদের আলাদা রুমে আটকে নিচের শর্ত দিল: সিচুয়েশন- ১: উভয় আসামি নীরব থাকবে এবং কেউ কারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিলে উভয়ের ১ বছর করে জেল হবে। একে বলা হয় পারস্পরিক সহযোগিতা। সিচুয়েশন- ২: A যদি স্বীকার করে আর B নীরব থাকে, তবে A খালাস পাবে এবং B এর ১০ বছর জেল হবে এবং vice versa । সিচুয়েশন- ৩: উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে উভয়ের ৫ বছর করে জেল হবে (পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকতা)। যৌক্তিক ফলাফল: নিজের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দুজনই একে অপরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় (বিশ্বাসঘাতকতা করে)। ফলে তারা সেরা ফলাফল (১ বছর জেল) বাদ দিয়ে দ্বিতীয় খারাপ ফলাফল (৫ বছর জেল) বেছে নিতে বাধ্য হয়। গেম থিওরির ভাষায় একে ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম (Nash Equilibrium) বলে।
আইনের ভাষায় প্রিজনারস ডিলেমা কি?
আইনের ভাষায় এবং বিচারিক ব্যবস্থায় প্রিজনারস ডিলেমা হলো এমন একটি কৌশলগত পরিস্থিতি, যেখানে অপরাধের তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় একাধিক অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেদের সর্বোচ্চ আইনি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টায় একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আইনজীবীরা অপরাধীদের মুখ খোলানো এবং সাজা নিশ্চিত করার জন্য এই মনস্তাত্ত্বিক ও গেম থিওরি মডেলটি সরাসরি ব্যবহার করেন। আইনি প্রক্রিয়ায় এর মূল উপাদানসমূহ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (Confession): পুলিশ বা প্রসিকিউশন অভিযুক্তদের আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একজনকে বলা হয়, “তুমি অপরাধ স্বীকার করলে তোমার সাজা কম হবে বা তুমি মাফ পাবে, কিন্তু অন্যজন ফেঁসে যাবে।” প্লি বারগেইনিং (Plea Bargaining): আদালতে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগে কম সাজার বিনিময়ে দোষ স্বীকার করার আইনি চুক্তি। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের বিচার ব্যবস্থায় বহুল ব্যবহৃত। সহযোগী বা রাজসাক্ষী (Approver/State Witness): আইনের ভাষায় অপরাধের সাথে জড়িত কাউকে ক্ষমা বা সাজা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের সহযোগীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ানো।
আইনি প্রয়োগের পদ্ধতি-
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: অভিযুক্তদের সম্পূর্ণ আলাদা কক্ষে রাখা হয় যেন তারা নিজেদের মধ্যে কোনো আইনি পরামর্শ বা চুক্তি করতে না পারে।
তথ্যের অসঙ্গতি তৈরি: তদন্ত কর্মকর্তা একজনের কাছে দাবি করেন যে অন্যজন অলরেডি সব স্বীকার করে নিয়েছে।
স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি: আসামিদের আইনজীবীদের আলাদা করা হয়। ফলে প্রত্যেকে কেবল নিজের মক্কেলের সাজা কমানোর চিন্তা করে, যা যৌথ প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করে দেয়।
আইনি ফলাফল ও প্রভাব- প্রসিকিউশনের জয়: এই কৌশলের ফলে আসামিরা নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রমাণ ও সাক্ষ্য দিয়ে দেয়। ফলে পর্যাপ্ত বাহ্যিক প্রমাণ না থাকলেও পুলিশ সহজে মামলা সাজাতে পারে।
যৌথ অপরাধ দমন: দলবদ্ধ অপরাধ, মাদক চক্র, চোরাচালান বা কর্পোরেট জালিয়াতির মতো মামলায় মূল হোতাদের ধরতে এই পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর আইনি হাতিয়ার। বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ- ব্যবসা ও অর্থনীতি: দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণে এই সমস্যায় পড়ে। উভয়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখলে খরচ বাঁচে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী এগিয়ে যাবে এই ভয়ে উভয়েই কোটি কোটি টাকা বিজ্ঞাপনে খরচ করে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি: পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এর বড় উদাহরণ। দুই দেশই অস্ত্র কমালে শান্তি বজায় থাকে। কিন্তু অন্য দেশ আক্রমণ করতে পারে এই ভয়ে উভয় দেশই বিপুল অর্থ খরচ করে অস্ত্র বাড়াতে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন: সব দেশ কার্বন নির্গমন কমালে পৃথিবীর লাভ। কিন্তু একক দেশ হিসেবে নির্গমন কমাতে গেলে শিল্পোৎপাদন কমে যাওয়ার ভয়ে কেউ আগে উদ্যোগ নিতে চায় না।
ক্রীড়া জগৎ: ডোপিং বা নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার। সব অ্যাথলেট ড্রাগ মুক্ত থাকলে প্রতিযোগিতা ফেয়ার হয়। কিন্তু অন্যজন ড্রাগ নিয়ে এগিয়ে যাবে এই ভয়ে অনেকেই গোপনে ড্রাগ ব্যবহার শুরু করে।

