শাস্তির তত্ত্ব বা Theories of Punishment : শাস্তির তত্ত্ব বা Theories of Punishment বলতে অপরাধীকে সাজা দেওয়ার পেছনে থাকা বিভিন্ন দার্শনিক এবং আইনি যুক্তিগুলোকে বোঝায়। মূলত কেন শাস্তি দেওয়া হবে এবং শাস্তির উদ্দেশ্য কী হবে, তা এই তত্ত্বগুলো ব্যাখ্যা করে।
১. প্রতিশোধমূলক তত্ত্ব (Retributive Theory): প্রাগৈতিহাসিক সমাজে শাস্তি ছিল প্রতিশোধমূলক। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অপরাধীর উপর প্রতিশোধ নিতে পারত। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো “চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত”। এটি বিশ্বাস করে যে অপরাধী অন্যায় করেছে, তাই তাকে অবশ্যই কষ্ট বা শাস্তি ভোগ করতে হবে। শাস্তির লক্ষ্য এখানে নৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া। তবে অপরাধীর অপরাধের জন্য শাস্তি নিজে কোনো প্রতিকার না। এটি কেবলমাত্র শাস্তির কিঞ্চিৎ অংশ উপশম করে। প্রতিশোধ গ্রহন হলো বুনো ন্যায়বিচার। Justice Oliver Wendel Holmes এর ভাষায় “প্রতিশোধের আগ্রহকে আমরা ব্যক্তির জন্য বা আইন প্রনয়নকারীদের জন্যও উৎসাহিত করি না। অনেক অপরাধ আছে যার জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ জরুরী না”। সুতরাং প্রতিশোধ শাস্তির একটি গৌণ উদ্দেশ্য।
২. নিবারণমূলক তত্ত্ব (Deterrent Theory): অপরাধ আইনের মূল লক্ষ্য হলো অপরাধীকে এমন শাস্তি দেওয়া যাতে সে ভবিষ্যতে আর অপরাধ করার সাহস না পায় এবং অন্যদের জন্য এটি একটি উদাহরণ বা সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা এবং মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করা এর অন্যতম লক্ষ্য। John Locke এর মতে শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে অপরাধ থেকে ফেরানোই নয় বরং তার শাস্তিকে অন্যের কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা। এক বিচারক বলেছিলেন ” আমি তোমাকে ভেড়া চুরি করার জন্য শাস্তি দেই না, বরং শাস্তি দেই যাতে ভেড়া আর চুরি না হয়”। এজন্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত যাতে করে অন্যরা সেই শাস্তি থেকে শিক্ষা লাভ করে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রনে এই তত্ত্বের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের আইনে যত কঠোর শাস্তিই থাকুক না কেন কিছু মানুষ অপরাধ করবেই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধীর মধ্যে আইনের ভয় তৈরি করতে পারে না বরং অপরাধীকে আরো শক্ত করে দেয়।
৩. প্রতিরোধমূলক তত্ত্ব (Preventive Theory): এই তত্ত্বের লক্ষ্য হলো অপরাধীকে শারীরিকভাবে অক্ষম করে দেওয়া বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা (যেমন—কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড), যাতে সে আর কোনো অপরাধ করতে না পারে। এটি অপরাধ দমনের চেয়ে অপরাধীর অপরাধ করার সুযোগ বন্ধ করার ওপর জোর দেয়। Justice Holmes এর মতে শাস্তির একমাত্র সর্বজনীন এবং প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিরোধ বা নিবৃত করা। কেউ যদি নির্দিষ্ট ক্ষতিকর কাজ করে তবে আইন তাকে সাবধান করে দেয় যেন সে কাজটি আর না করে। যেমন: কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হলো। যেহেতু তার লাইসেন্স নেই সে আর গাড়ি চালাতে পারবে না।
৪. সংশোধনমূলক তত্ত্ব (Reformative Theory): আধুনিক আইনের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্ব মনে করে যে অপরাধ একটি মানসিক ব্যাধি এবং উপযুক্ত শিক্ষা, নৈতিক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে অপরাধীকে সংশোধন করে একজন সুস্থ ও আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অপরাধীদের সাথে সহানুভূতি, কৌশল এবং ভালোবাসার আচরণের মাধ্যমে তাদের চরিত্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এমনকি ভদ্র এবং সুন্দর পরামর্শের মধ্য দিয়ে অনেক কঠোর অপরাধীও পালটে যেতে পারে। কঠোর শাস্তি বরং তাদেরকে হতাশ করে দেয়। মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিশোধ পরায়ণতা। কোনো অপরাধীকে ফাঁসি দেওয়ার অর্থ হলো মানবজাতি সেই ব্যক্তির ভুল শুধরে দিতে পারে নি। শারিরীক শাস্তি মানুষের কোমলতা নষ্ট করে দেয়। এজন্য এই তত্ত্বে শুধুমাত্র মৃদু কারাবাস এবং সংশোধন সাপেক্ষে উন্নয়নের দিকে আলোকপাত করা হয়।
৫. ক্ষতিপূরণমূলক বা প্রায়শ্চিত্তমূলক তত্ত্ব (Expiatory/Compensatory Theory): এই তত্ত্বে গুরুত্ব দেওয়া হয় যে অপরাধী তার অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং প্রয়োজনে ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিপূরণ দেবে। এটি অপরাধের দায় মেটানোর ওপর আলোকপাত করে। এই তত্ত্বের সমালোচকদের মতে এটি অপরাধের উদ্দেশ্য কে ঘুরিয়ে দিতে কাজ করে। একটি অপরাধের উদ্দেশ্য সব সময় অর্থ সংক্রান্ত নয়। রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ, ন্যায়বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপরাধ, ধর্মের বিরুদ্ধে অপরাধ, বিয়ে সংক্রান্ত অপরাধ এগুলো অর্থ দিয়ে ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় না। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে এই তত্ত্ব কার্যকর নাও হতে পারে। একটি আদর্শ ফৌজদারি ন্যায়বিচার ব্যবস্থা একটি শাস্তি তত্ত্বের উপর নির্ভর করতে পারে না। প্রতিটি তত্ত্বেরই আলাদা সুবিধা বা উপকারী দিক রয়েছে। বিচারের সময় শুধু সেই ভালো দিক গুলা ব্যবহার করেই বিচার করা উচিত।

