পরিবার সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে মতবিরোধ, কলহ বা বিরোধ (Family Dispute) সৃষ্টি হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বিরোধ পারস্পরিক আলোচনা, পারিবারিক সমঝোতা কিংবা সামাজিক সালিশের (Mediation/Arbitration) মাধ্যমে মীমাংসা করা সম্ভব হলেও, অনেক সময় তা আর সম্ভব হয় না। যখন কোনো বিরোধ আইনি পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং আইনগত প্রতিকার (Legal Remedy) গ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর উপায় অবশিষ্ট থাকে না, তখন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে পারিবারিক আদালতের (Family Court) শরণাপন্ন হতে হয়।
এই উদ্দেশ্যেই পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে পারিবারিক বিরোধ দ্রুত, সহজ ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা যায়। সাধারণ দেওয়ানি আদালতের মতো পারিবারিক আদালত সব ধরনের দেওয়ানি বিরোধের বিচার করে না; বরং আইন দ্বারা নির্ধারিত কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা (Jurisdiction) প্রয়োগ করে।
পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ধারা ৪(৫) অনুযায়ী, মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার কেবল পাঁচটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ। এই পাঁচটি বিষয় পারিবারিক সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং সন্তানের কল্যাণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় সাধারণত সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালত পারিবারিক আদালত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। সরকার প্রয়োজনে গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনো আদালতকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারিবারিক আদালত হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। তবে আদালতের নাম ভিন্ন হলেও এর বিচারিক ক্ষমতা বা এখতিয়ারে কোনো পরিবর্তন হয় না।
পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত পাঁচটি প্রধান মামলা হলো—
১. বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce)
২. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার (Restitution of Conjugal Rights)
৩. দেনমোহর বা মোহরানা (Dower)
৪. ভরণপোষণ (Maintenance)
৫. সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত (Guardianship and Custody of Children)

নিচে প্রতিটি বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce): বিবাহবিচ্ছেদ হলো স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্কের আইনসম্মত অবসান। তবে সব ধরনের বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আদালতে মামলা করতে হয় না। মুসলিম পারিবারিক আইনে স্বামী সাধারণত আদালতের বাইরে তালাক দিতে পারেন এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা কার্যকর হয়। অন্যদিকে স্ত্রীর ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন হয়।
যেমন—
আদালতের মাধ্যমে তালাক (Judicial Divorce): যদি কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফওয়ীজ) প্রদান করা না থাকে, তাহলে স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে হয়।
খোলা (Khula): স্ত্রী স্বামীকে নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ বা দেনমোহরের অংশ ফেরত দিয়ে বিবাহবিচ্ছেদে সম্মত করাতে পারেন। উভয়ের সম্মতি থাকলে আদালতের প্রয়োজন হয় না।
মোবারাত (Mubara’at): স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ সংঘটিত হয়। তবে বিরোধ সৃষ্টি হলে আদালতের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
উদাহরণ: স্বামী দীর্ঘদিন স্ত্রীকে নির্যাতন করছেন এবং কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারেন।
২. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার (Restitution of Conjugal Rights): বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে বসবাস করা এবং বৈবাহিক দায়িত্ব পালন করা উভয়ের আইনি অধিকার ও কর্তব্য। যদি স্বামী বা স্ত্রী কোনো বৈধ কারণ ছাড়া সংসার ত্যাগ করেন বা অপর পক্ষের সঙ্গে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ পারিবারিক আদালতে দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলা করতে পারেন।
এই মামলার উদ্দেশ্য বিচ্ছেদ নয়; বরং বৈবাহিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা।
- আদালত যেসব বিষয় বিবেচনা করেন
- সংসার ত্যাগের কারণ বৈধ কি না
- নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা বা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ আছে কি না
- উভয় পক্ষের আচরণ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ।
উদাহরণ: কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে গেছেন এবং স্বামীর কাছে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। স্বামী পারিবারিক আদালতে দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের মামলা করতে পারেন।
৩. দেনমোহর বা মোহরানা (Dower): দেনমোহর হলো মুসলিম বিবাহে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক অধিকার। এটি স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি এবং আইনগতভাবে আদায়যোগ্য।
স্বামী যদি নির্ধারিত দেনমোহর পরিশোধ না করেন, তাহলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন।
দেনমোহরের ধরন:
তাৎক্ষণিক (Prompt Dower): স্ত্রীর দাবির সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধযোগ্য।
বিলম্বিত (Deferred Dower): বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যু অথবা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধযোগ্য।
তামাদির মেয়াদ: তাৎক্ষণিক দেনমোহরের ক্ষেত্রে দাবি প্রত্যাখ্যানের তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
বিলম্বিত দেনমোহরের ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হওয়া বা স্বামীর মৃত্যুর তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
উদাহরণ: কাবিননামায় ১০ লক্ষ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বামী মাত্র ২ লক্ষ টাকা পরিশোধ করেছেন। স্ত্রী বাকি ৮ লক্ষ টাকা আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
৪. ভরণপোষণ (Maintenance): ভরণপোষণ বলতে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় ব্যয় বোঝায়। মুসলিম আইনে স্বামী তার স্ত্রীর এবং আইন অনুযায়ী সন্তানের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
যদি স্বামী যৌক্তিক কারণ ছাড়া ভরণপোষণ প্রদান না করেন, তাহলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।
আদালত যেসব বিষয় বিবেচনা করেন:
- স্বামীর আয় ও আর্থিক সক্ষমতা
- স্ত্রীর প্রয়োজন
- সন্তানের সংখ্যা ও বয়স
- জীবনযাত্রার মান।
তামাদির মেয়াদ: স্ত্রী যেদিন ভরণপোষণ দাবি করবেন, সেদিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
উদাহরণ: স্বামীর মাসিক আয় ৭০,০০০ টাকা হলেও তিনি স্ত্রী ও সন্তানের কোনো খরচ বহন করছেন না। স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে মাসিক ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
৫. সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত (Guardianship and Custody): স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ, পৃথক বসবাস বা অন্য কোনো কারণে সন্তানের লালন-পালন, অভিভাবকত্ব ও হেফাজত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে পারিবারিক আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন।
আদালতের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো: “সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ (Best Interest of the Child)”
আদালত সাধারণত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করেন—
- সন্তানের বয়স
- শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা
- শিক্ষা ও নিরাপত্তা
- পিতা-মাতার চরিত্র ও সক্ষমতা
- সন্তানের ভবিষ্যৎ কল্যাণ।
উদাহরণ: বিবাহবিচ্ছেদের পর মা সন্তানের হেফাজত চান এবং বাবা অভিভাবকত্ব দাবি করেন। আদালত উভয় পক্ষের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করে সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থে সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন।
পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর অধীনে পারিবারিক আদালত কেবল পাঁচটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে—বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত। এসব মামলার মাধ্যমে আদালত শুধু আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি করে না; বরং পরিবারে ন্যায়বিচার, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুর আইনগত অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই পারিবারিক বিরোধ দেখা দিলে প্রথমে পারস্পরিক সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত; তবে তা ব্যর্থ হলে আইনের আশ্রয় নিয়ে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার গ্রহণ করাই সর্বোত্তম পথ।

