রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এই অর্থের প্রধান উৎস হলো কর বা ট্যাক্স (Tax) । নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে আইন অনুযায়ী যে অর্থ সরকার আদায় করে এবং যা জনকল্যাণে ব্যয় করা হয়, তাকে কর বা ট্যাক্স বলা হয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কর প্রদান শুধু একটি আইনগত বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক কর্তব্য।
- কর বা ট্যাক্স কী?
কর বা ট্যাক্স (Tax) হলো সরকার কর্তৃক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সম্পদ, পণ্য বা সেবার ওপর আইন অনুযায়ী আরোপিত বাধ্যতামূলক আর্থিক অবদান। এই অর্থ সরকার দেশের উন্নয়ন, জনসেবা, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করে। বাংলাদেশে কর প্রশাসনের প্রধান কর্তৃপক্ষ হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue – NBR)।
বাংলাদেশে কর ব্যবস্থা মূলত দুই ধরনেরঃ
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax) এবং পরোক্ষ কর (Indirect Tax)। কর আদায়ের পদ্ধতি, করের বোঝা বহনকারী ব্যক্তি এবং সরকারের কাছে কর জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে এই দুটি শ্রেণিতে করকে বিভক্ত করা হয়েছে। দেশের রাজস্ব সংগ্রহে উভয় ধরনের করই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax) কী?
প্রত্যক্ষ কর হলো এমন কর, যা সরকার সরাসরি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করে এবং যার করের বোঝা অন্য কারও ওপর স্থানান্তর করা যায় না। অর্থাৎ, যিনি কর প্রদান করেন তিনিই এর সম্পূর্ণ দায়ভার বহন করেন। যেমন- একজন ব্যক্তি তার আয়ের ওপর যে আয়কর প্রদান করেন, সেই কর অন্য কারও কাছ থেকে আদায় করতে পারেন না। তাই এটি প্রত্যক্ষ কর।
বাংলাদেশে প্রচলিত প্রত্যক্ষ করঃ
১. আয়কর (Income Tax)ঃ বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আয়কর। নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি আয় করলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইন অনুযায়ী আয়কর প্রদান করতে হয়।
২. কোম্পানি কর (Corporate Tax)ঃ দেশে পরিচালিত বিভিন্ন কোম্পানি তাদের অর্জিত মুনাফার ওপর সরকারকে কোম্পানি কর প্রদান করে।
৩. মূলধনী মুনাফা কর (Capital Gains Tax)ঃ জমি, শেয়ার বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে অর্জিত নির্দিষ্ট ধরনের মুনাফার ওপর আইন অনুযায়ী কর আরোপ করা হয়।
৪. উপহার কর (Gift Tax)ঃ বিশেষ পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী উপহার বা সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর প্রযোজ্য হতে পারে।
পরোক্ষ কর (Indirect Tax) কী?
পরোক্ষ কর হলো এমন কর, যা সরকার সরাসরি ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করে না। বরং ব্যবসায়ী, উৎপাদক বা সেবা প্রদানকারী সরকারের কাছে কর জমা প্রদান করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই করের বোঝা বহন করে থাকে ভোক্তা। অর্থাৎ, কোন ব্যক্তি যখন কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয় করে, তখন তার মূল্যের মধ্যেই কর অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে ঐ ব্যক্তি পরোক্ষভাবে কর প্রদান করে।
বাংলাদেশে প্রচলিত পরোক্ষ করঃ
১. মূল্য সংযোজন কর (VAT)ঃ পণ্য ও সেবা বিক্রির সময় আরোপিত করকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বলা হয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎস।
২. সম্পূরক শুল্ক (Supplementary Duty)ঃ বিলাসবহুল বা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ কিছু পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়।
৩. কাস্টমস শুল্ক (Customs Duty)ঃ বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির সময় সরকার যে কর আদায় করে তাকে কাস্টমস শুল্ক বলা হয়।
৪. আবগারি শুল্ক (Excise Duty)ঃ নির্দিষ্ট কিছু সেবা, ব্যাংকিং কার্যক্রম বা বিশেষ প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত কর।
৫. স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty)ঃ বিভিন্ন আইনি দলিল, চুক্তিপত্র, সম্পত্তি নিবন্ধন ও অন্যান্য সরকারি নথিতে আরোপিত কর।
বাংলাদেশের করব্যবস্থা মূলত প্রত্যক্ষ কর এবং পরোক্ষ কর—এই দুই ভিত্তির ওপর পরিচালিত হয়। প্রত্যক্ষ কর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফার ওপর আরোপিত হয় এবং করদাতা নিজেই এর বোঝা বহন করে। অন্যদিকে, পরোক্ষ কর পণ্য ও সেবার মাধ্যমে আদায় করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা এর ব্যয় বহন করে।
দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এই দুই ধরনের করই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

